রাজধানীর মহাখালী আমতলিতে স্থাপিত খাজা টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের টেলিকম খাত। ৩ টেলিকম কর্মীর মৃত্যু ও অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হওয়া ছাড়াও ইন্টারনেট সঞ্চালনায় ব্যবহৃত টিলিকম সরঞ্জাম পুড়েছে। যেগুলো আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছে সেগুলো পানিতে নষ্ট হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভবনের দোতলায় একটি ব্যাংক ছাড়া পুরো ভবনেই রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অনেকগুলো কোম্পানির অফিস ও সরঞ্জাম। ছয়টি ফ্লোর জুড়ে সাইফ পাওয়ারটেকের সার্ভার ও অফিস। নবম ও দশম তলায় আর্থ গ্রুপ ও রেইস অনলাইনের অফিস ও ডেটা সেন্টার। ১২ তলার পুরোটা ও ১১ তলার কিছু অংশ জুড়ে এনআরবি টেলিকমের ডেটা সেন্টার। চতুর্থ তলায় রয়েছে গ্রামীণফোনের একটি ডেটা সেন্টার। আগুনে এগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি। অবশ্য আটকে পড়া বেশিরভাগ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সূত্রমতে, খাজাটওয়ার অগ্নিকাণ্ডে দেশে বর্তমানে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর (১ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার) মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ তথা প্রায় ৫০ লাখ ব্যবহারকারী বিপাকে পড়েছেন। তারা এরইমধ্যে ইন্টারনেট সেবার বাইরে চলে গেছেন। আর যারা পাচ্ছেন তারমধ্যে অনেকে ধীরগতির ইন্টারনেটও পাচ্ছেন। কেননা, দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করে থাকে লেভেল থ্রি, সামিট কমিউনিকেশন্স, ফাইবার অ্যাট হোম ও আমরা নেটওয়ার্কস। এরমধ্যে আমরা নেটওয়ার্কস আইআইজি পুরোপুরি বসে গেছে। লেভেল থ্রি পুরোপুরি বসে গেলেও এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ৯৫ শতাংশ ব্যান্ডউইথ ব্যাকআপে চলে গেছে। ফলে মাত্র ৫ শতাংশ ব্যান্ডউইথে সমস্যা হচ্ছে লেভেল থ্রির।
অপরদিকে দেশের মোট মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর (১১ কোটি ৯৭ লাখ ৯০ হাজার) অন্তত ২০ শতাংশ তথা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ গ্রাহক ইন্টারনেট পাচ্ছেন না। ভয়েস কলেও তারা বিড়ম্বনায় পড়ছেন। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অ্যাপ -নির্ভর যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সমস্যা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর মহাখালী এলাকার ১৪তলা বাণিজ্যিক ভবন খাজা টাওয়ারে আগুন লাগে। শর্ট সার্কিট থেকে এ আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে পর্যায়ক্রমে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের ১২ ইউনিট। এছাড়া ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করেন সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা। সাত প্লাটুন আনসার সদস্য ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। এরপর প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের মতে, যে তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল সেখানে একটি আইএসপি অফিস রয়েছে। ওই ভবনে আরো আইআইজি ও আইএসপি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সবগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন কড়া ও আগুনে পোড়ায় সারাদেশে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সেখানে আটকে পড়া বেশিরভাগ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। ভবন থেকে এ পর্যন্ত ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। এদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন জানান, খাজা টাওয়ার ভবনটিতে ‘সেফটি প্ল্যান’ ছিল না। বিভিন্ন ফ্লোরে কিছু ফায়ার এক্সটিংগুইশার পাওয়া গেছে, সেগুলো কাজ করছিল। কিন্তু দাহ্য পদার্থ বেশি থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে যায়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখন প্রতিটি ফ্লোরে তল্লাশির কাজ চলছে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, আগুন লাগার দুটি মত আছে। কেউ বলছেন, চারতলা থেকে ৯, ১০ ও ১১ তলায় দ্রুত ছড়িয়ে গেছে। আবার কেউ বলছে, ১১ তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে যখন আমরা তদন্ত শেষ করব, তখন বলা যাবে কোথা থেকে এবং কী কারণে আগুনের সূত্রপাত। আপাতত মনে হচ্ছে, কোনো বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়তো আগুন লেগেছে।
পরিদর্শন শেষে মহাপরিচালক বলেছেন, “এখনও ভেতরে আগুন আছে, যার জন্য ধোঁয়া হচ্ছে। ধোঁয়ার অনেকগুলো কারণ- এখানে ব্যাটারি আছে, স্টোর আছে, এখানে প্রচুর কেবল-সুইচ আছে এবং ১২, ১৩, ১৪ তলায় সুসজ্জিত ‘ইন্টেরিয়র’ যা আগুন জ্বলতে বিশেষ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। যার জন্য এখনো আগুন আছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে আগুন কন্ট্রোলে কিন্তু আমাদের পুরোপুরি নির্বাপন করতে সময় লাগবে।”